ইথিক্যাল হ্যাকিং কি? ইথিক্যাল হ্যাকিং শিখতে হলে কি কি বিষয়ে জানতে হবে

হ্যাকিং শব্দটির নাম শুনলেই কেন জানি আমাদের মনের মধ্যে একটা আতংক তৈরি হয়। হ্যাকিং শব্দটি শুনলেই মনে হয়  যেন নিশ্চয়ই কোনো না কোন সমস্যার মধ্যে পড়তে যাচ্ছি। আমরা আগেই জেনেছি যে, হ্যাকার হচ্ছে প্রধানত দুই প্রকার যেমন: 

  • হোয়াইট হ্যাট হ্যাকার (white hat hacker)
  • ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকার (Black hat hacker)

হোয়াইট হ্যাট হ্যাকার হচ্ছে মূলত কারাে ক্ষতি না করার জন্যে হ্যাকিং কার্যক্রম করে থাকে। ইথিক্যাল হ্যাকাররা কর্তৃপক্ষের অনুমতি ক্রমে সিস্টেম এর বাগ (BUG) বা ভুলত্রুটি খুঁজে বাহির করে এবং সেটি সঠিক করে দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ উপার্জন করে থাকে।

অন্যদিকে ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকাররা কোনো সিস্টেমের কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যাতীত সিস্টেমে ভুলত্রুটি খুঁজে বের করে সিস্টেম বা সাইটের মধ্যে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করে সিস্টেমের বিভিন্ন রকমের ক্ষতি এবং তথ্য চুরি করে । চলুন জেনে নেয় হ্যাকিং এবং ইথিক্যাল হ্যাকিং সম্পর্কে বিস্তারিত সকল তথ্য

হ্যাকিং কি

হ্যাকিং হচ্ছে এমন এক ধরনের বেআইনি প্রচেষ্টার যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের গোপনীয় তথ্য, তার বা তাদের অনিচ্ছায়  তথ্য বা ফাইল চুরি বা পরিবর্তন করা।

আপনি হয়তো ভাবছেন বিষয়টা কতটা মজার হতে পারে। যদি আপনি সিস্টেমটা জানতেন তবে হয়তো আপনি আপনার বন্ধুদের সাথে অনেক মজা করতে পারতেন। তাই তো?

কিন্তু আপনার হয়তো ধারনাই নেই হ্যাকিং বিষয়টা কতটা ভয়াবহ হতে পারে। হ্যাকিং যতটা কঠিন বিষয় ঠিক ততটাই মারাত্মক হতে পারে একজন মানুষ ,প্রতিষ্ঠান কিংবা  দেশের জন্য আপনি হয়তো জানতেই পারবেননা যে একজন হ্যাকার আপনার কম্পিউটার বা মোবাইল ফোনের সকল তথ্য  চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে।

সেখানে থাকতে পারে আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ডিটেইলস, থাকতে পারে আপনার একান্ত প্রয়োজনীয় ছবি আরো অনেক কিছুই! যা আপনি অন্য কাউকে সহজে দেখাতে বা জানাতে ভয় পাবেন স্পর্শকাতর এই জিনিসগুলো একজন হ্যাকার খুব সহজে আপনার ডিভাইস থেকে চুরি করে নিয়ে যেতে পারে।

ইথিক্যাল হ্যাকিং কি?

ইথিক্যাল (Ethical) শব্দের বাংলা অর্থ হল ‘নৈতিক’ অর্থাৎ ‘বৈধ’। মানে ইথিক্যাল হ্যাকিং এর বাংলা আভিধানিক অর্থ হচ্ছে “নৈতিক বা “বৈধ হ্যাকার”। তাহলে সাধারণভাবে বুঝাই যাচ্ছে যে হোয়াইট হ্যাট হ্যাকারই হচ্ছে মূলত ইথিক্যাল বা ইথিক্যাল হ্যাকার!

আমরা অনেক সময়ে দেখি যে, কিভাবে ফেসবুক আইডি হ্যাক করা যায়, ওয়াইফাই পাসওয়ার্ড হ্যাক করার উপায়, ফেসবুক হ্যাকিং সফটওয়্যার android, অন্যের মোবাইল হ্যাক করার উপায়, ওয়াইফাই হ্যাক করার সফটওয়্যার, বিকাশ একাউন্ট হ্যাকিং, মোবাইল দিয়ে ফেসবুক আইডি হ্যাক, হ্যাকিং শিখার বই, হ্যাকিং সফটওয়্যার ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের নামে বিভিন্ন নামে চটকদার সব আর্টিকেল দেখতে পাই। যেখানে আসলে হ্যাকিং শেখানো হোক অথবা না হোক সেখানে হ্যাকিং  শেখার মূল বিষয় হচ্ছে মানুষের ক্ষতি করা।

তাছাড়াও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পত্রিকা, খবরে দেখতে পাই যে ব্যাংক একাউন্ট হ্যাকিং এর মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করছে। অথবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হ্যাকিং এর মাধ্যমে স্পর্শ কাতর সব তথ্য নিয়ে ব্ল্যাক মেইলের মাধ্যমে অর্থ দাবি করছে ইত্যাদি। এসকল কার্যকলাপ হচ্ছে আসলে ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকারদের। তারা তাদের নিজেদের স্বার্থ হাসিল করার জন্য মানুষের ক্ষতি সাধন করে থাকে।

এছাড়াও সমাজ ও দেশের কাছে তারা অপরাধী তাই ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকাররা সব সময়ের জন্য আত্মগোপন করে থাকে। কিন্তু যদি আপনি একজন ইথিক্যাল হ্যাকার বা হোয়াইট হ্যাট হ্যাকার হয়ে কাজ করেন তবে আপনি সগৌরবে বলতে পারবেন যে আপনি একজন বৈধ বা ইথিক্যাল হ্যাকার। আর আপনার জন্যে থাকবে না কোন রকম আইনি জটিলতা আর থাকবে না কোন সামাজিক নিন্দা।

ইথিক্যাল হ্যাকার কিভাবে কাজ করে

একজন ইথিক্যাল হ্যাকার এর কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে একজন ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকার এর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। একজন হোয়াইট হ্যাট হ্যাকার বা ইথিক্যাল হ্যাকার মূলত কাজ করে থাকে কোনো সিস্টেমের ভুলত্রুটি খুঁজে বাহির করার জন্যে। আমরা জানি কোনো সিস্টেম অথবা নেটওয়ার্কের মধ্যে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করা এবং সেটার কন্ট্রোল নেয়া আইনত ভাবে অপরাধ। এই কারণে একজন ইথিক্যাল হ্যাকার মূলত কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষ্যে সিস্টেমের ভুলত্রুটি খুঁজে বের করে। আমরা অবশ্যই জানি যে কোনো কিছুরই শতভাগ ভুলত্রুটি মুক্ত নয়। একটি ত্রুটি ঠিকঠাক করলেও নতুন আরো অনেক ত্রুটি আমাদের অগোচরে থেকে যায়।

তারপরেও সুরক্ষা বা সিকিউরিটি নিশ্চিত করার জন্য অবশ্যই আমাদের কোনো সিস্টেমের ভুলত্রুটি খুঁজে বের করা এবং সেটি সঠিক করা অবশ্যই কর্তব্য। আর এই কাজটি মূলত করে থাকে একজন হোয়াইট হ্যাট হ্যাকার বা ইথিক্যাল হ্যাকার। ইথিক্যাল হ্যাকাররা তাদের হ্যাকিং দক্ষতা কাজে লাগিয়ে একটি সাইট বা সিস্টেমের ত্রুটি খুঁজে বের করে এবং সিস্টেমের এক্সেস নেয়। কিন্তু একজন ইথিক্যাল হ্যাকার সিস্টেমের কোন ক্ষতিসাধনের পরিবর্তে সিস্টেমের ভুলত্রুটি গুলোকে কর্তৃপক্ষের কাছে অবহিত করে আর সেই সমস্যা ঠিক করার জন্য কাজ করে থাকে। যেখানে একজন ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকার কোনো সিস্টেমের ভুলত্রুটি খুঁজে বাহির করে তাদের হ্যাকিং দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে সিস্টেমের এক্সেস বা নিয়ন্ত্রণে নেয় আর সেই সিস্টেমের ক্ষতি করে এবং সকল তথ্য চুরি করে নেয়। 

পক্ষান্তরে একজন ইথিক্যাল হ্যাকার সিস্টেমের এক্সেস বা নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরে কর্তৃপক্ষকে জানান যে সেই সমস্যা ঠিক করার জন্য কাজ করে। যাতে করে সিস্টেমের ব্যবহারকারীগণ কোনো ক্ষতির সম্মুখীন না হতে হয়। তাহলে এই সকল তথ্যগুলো হতে আপনি একজন হোয়াইট হ্যাট হ্যাকার বা ইথিক্যাল হ্যাকার ও অন্যান্য হ্যাকারের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারছেন।

ইথিক্যাল হ্যাকিং শিখতে হলে কি কি বিষয়ে জানতে হবেঃ

প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ: প্রথমত একজন হ্যাকার হতে হলে প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ সম্পর্কে সম্পূর্ণ জ্ঞান থাকতে হবে। প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ  বা ভাষা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান থাকা হচ্ছে একজন হ্যাকারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ।

বিভিন্ন ধরনের প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ রয়েছে । একজন হ্যাকারের জন্য সব ধরনের প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ সম্পর্কে জানা সব থেকে বেশি জরুরি। কারন, প্রোগ্রামিং ল্যাংগুয়েজের সাহায্য ছাড়া কোন হ্যাকার প্রসেসরকে পড়ার ক্ষমতাই রাখে না।

ইন্টারনেট এবং সার্চ ইঞ্জিন সম্পর্কে জ্ঞান: একজন হ্যাকার কে ইন্টারনেট এবং সার্চ ইঞ্জিন সম্পর্কে অনেক ভালো জ্ঞান রাখতে হয়।  তথ্য সংগ্রহের জন্য কার্যকরীভাবে কিভাবে সার্চ ইঞ্জিনগুলোকে ব্যবহার করা যায় তা সম্পর্কে জ্ঞান থাকা অত্যন্ত জরুরী। তাকে অবশ্যই জানতে হবে যে সার্চ ইঞ্জিন কি, কিভাবে কাজ করে এবং বিশ্বের সেরা সার্চ ইঞ্জিনগুলো কি কি।

লিনাক্স অপারেটিং সিস্টেম: তৃতীয়ত, প্রকৃত হ্যাকারকে যে বিষয়টি অবশ্যই জানা লাগে সেটা হচ্ছে একটি লিনাক্স ভিত্তিক অপারেটিং সিস্টেম এবং লিনাক্সের বেসিক কমান্ডগুলো জানতে হবে।

ধৈর্য: একজন ভাল ভালো দক্ষ এবং প্রকৃত হ্যাকারের অনেক বড় একটি গুণ হচ্ছে ধৈর্য।  ধৈর্য তাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। কোন কোন প্রোফাইল বা ওয়েবসাইট হ্যাক করতে কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন লাগে। আবার কোন কোন ওয়েবসাইট হ্যাক করার জন্য একাধিক হ্যাকার মিলে কয়েক মাস অথবা কয়েকবছর যাবৎ পরিশ্রম করতে হয়। তই ধৈর্য হ্যাকারদের অন্যতম একটি বড় বৈশিষ্ট্য এবং গুন।

নেটওয়ার্কিং দক্ষতা:  হ্যাকার হওয়ার জন্য প্রোগ্রামিং দক্ষতা এবং নেটওয়ার্কিং দক্ষতা  অপরিহার্য। হ্যাকিং কখনো সহজ কাজ ছিল না বা সহজ কাজও না। তবে বর্তমান সময়ে অনেকেই কম্পিউটার এবং মোবাইল ফিক্সড হ্যাকার হতে চায়।

কম্পিউটার দক্ষতা: কম্পিউটার দক্ষতা যে কতটা জরুরী হয়তো তা এতক্ষণে আপনারা নিজেই টের পেয়ে গেছেন । তাই আলাদা করে এই ব্যাপারে আর কিছু বলার নেই। তবে একজন প্রকৃত হ্যাকারের প্রধান এবং প্রথম কাজ হচ্ছে সব সময়  বিভিন্ন ধরনের সফটওয়্যার সম্পর্কে ধারণা রাখা এবং  এর সাথে কানেকশন রাখা। অর্থাৎ, হ্যাকিং এর  কাজে সাহায্য করতে পারে এমন সব সফটওয়্যার এর খবর রাখা।

পর্যবেক্ষন: ভালো হ্যাকার সবসময় একজন ভালো পর্যবেক্ষক হয়ে থাকে। সে তার টার্গেটকৃত বিষয়টি খুব নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করে। টার্গেটকৃত স্থানটির দুর্বল স্থান টিকে খুঁজে বের বের করার জন্য। একজন ভাল হ্যাকার এমন সব কিছু খেয়াল করে যা আপনার কাছে তুচ্ছ মনে হয়, আর যা আপনি কখনো ভেবে দেখেন নি কিন্তু প্রকৃত হ্যাকার  তারা তাদের কাজের জন্য সবকিছু পর্যবেক্ষন করে থাকে।

লক্ষ্যবস্তুকে ছোট না করে দেখা: একজন ভালো এবং দক্ষ হ্যাকার কখনোই তার লক্ষ্যবস্তুকে ছোট করে দেখে না। যার কারনে সে তার সবটুকু মেধা খাটিয়ে হ্যাকিং করতে পারে।

হ্যাকিং বই পড়াঃ বই পড়ে কখনোই হ্যাকার হতে পারবেন না শুধুমাত্র ধারণা নিতে পারবেন। বই পড়তে হবে, টিউটোরিয়াল দেখতে হবে এবং সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে অনুশীলন করতে হবে। আপনাদের জন্য নিচে কয়েকটি হ্যাকিং বইয়ের তালিকা দিলাম। ইথিক্যাল হ্যাকিং শিখতে হলে অবশ্যই বইগুলো পড়বেন।

Leave a Comment