ফ্যান রেগুলেটর কি বিদ্যুৎ খরচ কমায়? বিদ্যুৎ অপচয় রোধে করণীয়

একটি পাখায় একটি বৈদ্যুতিক মোটর এবং কয়েকটি ধাতব ব্লেড (সাধারণত ৩টি), সংযুক্ত থাকে। যখন আমরা একটি পাখার সুইচ অন করি, তখন ভোল্টেজের পার্থক্যের জন্য মোটরটির মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ যায় এবং তার ফলাফল হিসাবেই পাখাটি ঘুরতে থাকে। নিয়ন্ত্রক বা রেগুলেটর মোটরের ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ করে এবং মোটরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত বিদ্যুতের পরিমাণ কমিয়ে বা বাড়িয়ে দেয়।

সুতরাং, একটি পাখার ভোল্টেজর মাত্রা নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণরূপে তার নিয়ন্ত্রক বা রেগুলেটরের ওপর নির্ভরশীল। আর একটি পাখার ভোল্টেজের পরিমাণ তার ঘূর্ণন গতির সমানুপাতী, অর্থাৎ ভোল্টেজ যত বাড়বে, পাখার গতিও ততটাই বাড়বে।

গরমকালে বিদ্যুৎ চালিত ফ্যান/পাখা আমাদের অতি প্রয়োজনীয় একটি যন্ত্র। আর এই যন্ত্রের গতি নিয়ন্ত্রণ করা হয় রেগুলেটর দিয়ে। অর্থাৎ, ফ্যানের সাথে রেগুলেটরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রেগুলেটর না থাকলে আপনার ফ্যানের জোর/গতি কম-বেশি করতে পারবেন না। আর আমাদের প্রায় সকলেরই একটা কৌতূহল আছে যে, রেগুলেটর দিয়ে ফ্যানের গতি কমানো হলে কি বিদ্যুৎ খরচ কম হবে? নাকি জোরে চালালে এবং গতি কমালেও বিদ্যুৎ খরচ একই হয়? আজকে আপনাদের সাথে আলোচনা করব এই বিষয়টা নিয়ে। চলুন তাহলে, শুরু করি।

কোথাও যদি প্রশ্ন করা হয়, ‘ফ্যানের গতি কমালে কি বিদ্যুৎ খরচ একই থাকে নাকি খরচ কম হয়?’ তাহলে এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় দুই রকমের। কেউ বলে বিদ্যুৎ খরচ একই রকম  থাকবে। আবার কেউ বলে বিদ্যুৎ খরচ কমে যাবে। তাদের দুজনেরই উত্তর মোটামুটি সঠিক হয়েছে।দিশেহারা হয়ে যাচ্ছেন কী?  আসলে বিদ্যুৎ খরচ কমবে কি কমবে না, সেটা নির্ভর করবে কী ধরনের রেগুলেটর ব্যবহার করছেন তার ওপর। রেগুলেটর সাধারণত দুই প্রকারঃ

  • ইলেকট্রিক্যাল রেগুলেটর (রেজিস্টর বেসড্ রেগুলেটর)।
  • ইলেকট্রনিক রেগুলেটর

আপনি যদি ইলেকট্রিক্যাল রেগুলেটর ব্যবহার করেন, তাহলে গতি কমালে বা বাড়ালে বিদ্যুৎ খরচ একই থাকবে। আবার আপনি যদি ইলেকট্রনিক রেগুলেটর ব্যবহার করেন, তাহলে গতি কমালে বিদ্যুৎ খরচ কমে যাবে, গতি বাড়ালে বিদ্যুৎ বেশি খরচ হবে। এবার চলুন জেনে নেওয়া যাক, ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক রেগুলেটর কীভাবে চিনবেন।

কোনটি ইলেকট্রিক্যালল রেগুলেটর?

 এটা মুলত ওয়্যারউড রেজিস্টর বেসড রেগুলেটর। যে সকল বড়ো বড়ো রেগুলেটর আগে ব্যবহৃত হতো, যেগুলো সুইচ বোর্ডের অর্ধেকের বেশি জায়গা দখল করে এবং খুব গরম হয়। যদি খুলে দেখতে পারেন তাহলে দেখবেন যে, একটি লোহার কোর বা বডি  এর গায়ে প্রচুর পরিমাণে তামার তার পেঁচিয়ে তৈরি করা হয়েছে।

কোনটি ইলেকট্রনিক রেগুলেটর? 

এটা দেখতে অত্যন্ত ছোটো সাইজের হয়। প্রায় একটা সুইচ এর সমান। সুইচবোর্ডে একটি সুইচ এর সমান জায়গা দখল করে। খুব সামান্য গরম হয়। যদি খুলে দেখতে পারেন, তাহলে দেখবেন, এটা একটি ভ্যারিয়েবল রেজিস্টার, একটি কিংবা কয়েকটি ফিক্সড রেজিস্টার, ট্রায়াক এবং ডায়াক দিয়ে তৈরি ছোট্ট একটি সার্কিট। 

কার্যপ্রণালিঃ

ইলেকট্রিক্যাল রেগুলেটর: ইলেকট্রিক্যাল রেগুলেটর তৈরি করা হয় মূলত আয়রন কোরের গায়ে তামার তার পেঁচিয়ে। বিদ্যুৎ এই তারের ভেতর দিয়ে অনেক দূরত্ব অতিক্রম করে প্রবাহিত হওয়ার সময় কিছু বিদ্যুৎ শক্তি তাপ শক্তিতে রুপান্তরিত হয়ে যায়। ফলে ফ্যান পূর্ণ শক্তি পায় না এবং ফ্যানের রোটেশন/গতি কমে যায়। এতে মূল বিদ্যুৎ খরচ একই থাকছে। অর্থাৎ, ফ্যানের গতি কমলেও বিদ্যুৎ খরচ কমছে না। কারণ, রেগুলেটরের কিছু বিদ্যুৎ শক্তি তাপ শক্তিতে অপচয় করে দিচ্ছে, যার ফলে ফ্যান কম বিদ্যুৎ পাচ্ছে এবং আস্তে ঘুরছে।

ইলেকট্রনিক রেগুলেটর: ইলেকট্রনিক রেগুলেটর তৈরি হয় সাধারণত একটি ভ্যারিয়েবল রেজিস্টার, একটা বা কয়েকটা ফিক্সড রেজিস্টার, ট্রায়াক ও ক্যাপাসিটর দিয়ে। এখানে প্রধান ভূমিকা পালন করে ট্রায়াক। ট্রায়াকের সাথে ফিক্সড রেজিস্টার, ক্যাপাসিটর ও একটা ভেরিয়েবল রেজিস্টার দিয়ে একটা থাইরিস্টর জাতীয় ইলেকট্রনিক সুইচিং ডিভাইস তৈরি করা হয়। এটা মূলত খুব দ্রুত সুইচিং অর্থাৎ, সংযোগ অন-অফ করার মাধ্যমে ফ্যানের গতি কমিয়ে দেয়। আপনার নির্ধারণ করা পরিমাণে বিদ্যুৎ সাপ্লাই করে এবং রেগুলেটর নিজে খুব সামান্য পরিমাণে বিদ্যুৎ অপচয় করে। তাতে করে ফ্যানের গতি কমালে বিদ্যুৎ খরচও কমে যায়।

উদাহারন হিসেবে এনার্জি ড্রিংক ও বৈদ্যুতিক ফ্যানের গতি নিয়ে আলোচনা করা হল

একটি দৃশ্যপট কল্পনা করুন। মনে করুন আপনি রাস্তায় দৌড়াবেন। এখন দৌড়াতে গেলে আপনার এনার্জির প্রয়োজন হবে। তাই আপনি এনার্জি ড্রিংক খেয়ে নিলেন। এনার্জি ড্রিংক খেয়ে আপনি সজোরে দৌড়াতে লাগলেন। উল্লেখ্য যে, রাস্তাটা পুরোপুরি মসৃণ নয়। কোথাও কোথাও বন্ধুর অংশও রয়েছে। এক্ষেত্রে আপনার গতির নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করছে রাস্তার প্রকৃতি। বৈদ্যুতিক ফ্যান, বিদ্যুৎ ও রেগুলেটরের সম্পর্কটাও একই রকম।

একটি পাখায় একটি বৈদ্যুতিক মোটর এবং কয়েকটি ধাতব ব্লেড বা ডানা (সাধারণত ৩টি) সংযুক্ত থাকে। যখন আমরা একটি পাখার সুইচ চালু  করি, তখন ভোল্টেজ পার্থক্যের জন্য মোটরটির মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ যায় এবং তার ফলাফল হিসাবেই পাখাটি ঘুরতে থাকে। যেমনটি এনার্জি ড্রিংক খেয়ে আপনি পূর্ণদমে দৌড়ানো শুরু করেছিলেন। নিয়ন্ত্রক বা রেগুলেটর মোটরের ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ করে এবং মোটরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত বিদ্যুতের পরিমাণ কমিয়ে বা বাড়িয়ে দেয়। ঠিক যেভাবে রাস্তার প্রকৃতি আপনার দৌড়ের গতি নিয়ন্ত্রণ করেছে। সুতরাং, একটি পাখার ভোল্টেজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণরূপে তার নিয়ন্ত্রক বা রেগুলেটরের ওপর নির্ভরশীল। আর একটি পাখার ভোল্টেজের পরিমাণ তার ঘূর্ণন গতির সমানুপাতিক। অর্থাৎ ভোল্টেজ যত বাড়বে, পাখার গতিও ততটাই বাড়বে। গল্পের ছলে বললে এনার্জি ড্রিংক যত খাবেন আপনার দৌড়ানোর শক্তিও তত বাড়বে। 

বিদ্যুৎ অপচয় রোধে করণীয়ঃ

বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে কয়েকদিন ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। সরকার বলছে, গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বিদ্যুতের লোডশেডিং করতে হচ্ছে। আমরা নিজেদের অজান্তে প্রতিদিনই অনেক বেশি বিদ্যুৎ অপচয় করে ফেলি। একই সঙ্গে দিনকে দিন বাড়তে থাকা প্রযুক্তির পরিমাণ তো আছেই। বিদ্যুৎ ব্যবহারের সময় তা অপচয় হচ্ছে কি না সে বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। চলুন জেনে নেওয়া যাক বিদ্যুৎ অপচয় রোধে কী করণীয়-

  •  টিউব লাইটে ইলেকট্রিক্যাল ব্যালেষ্ট (চক) ব্যবহার না করে যদি ভালো মানের ইলেকট্রনিক্স ব্যালেষ্ট (চক) ব্যবহার করা যায়, তাহলে বিদ্যুৎ বিল কম অনেক আসবে 
  • প্রয়োজন ছাড়া ওভেন, ফ্যান, এসি এবং পিসি বন্ধ করে রাখুন।
  • ঘর থেকে বের হওয়ার সময় এসি,লাইট, ফ্যানের সুইচ বন্ধ করে দেওয়ার অভ্যাস করুন
  • ওভেন চালানোর অভ্যাস ত্যাগ করুন। বিশেষ করে মাইক্রোওয়েভ। রাইস কুকার, কারি কুকার ইত্যাদি একেবারেই বাধ্য না হলে ব্যবহার করবেন না
  • পানি গরম করার জন্য গিজার বা হিটার ব্যবহার কমিয়ে দিন।

Leave a Comment